শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ

সত্য সংবাদ, নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন

--°সে লোডিং...
নারায়ণগঞ্জ
শিরোনাম
সপ্তাহে একদিন উপজেলা কার্যালয়ে সরাসরি জনদুর্ভোগ শুনবেন এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে সিদ্ধিরগঞ্জে জামায়াতের আলোচনা সভা নাসিক ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন নির্বাচন: প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ, প্রচারণা শুরু নারায়ণগঞ্জে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাবার তৈরি ও গরু জবাই: 'আসলাম বিরিয়ানি'কে জরিমানা আড়াইহাজারে ২ মাদক ব্যবসায়ীকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড অটোরিকশায় সামান্য ধাক্কা: সিদ্ধিরগঞ্জে চালককে পিটিয়ে হত্যা, গ্রেপ্তার ১ সিদ্ধিরগঞ্জে মহাসড়কে বাসে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি: ডিবি পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ৪ বন্দর মুছাপুরে ব্যানার-ফেস্টুন ছেঁড়ার অভিযোগ: কাঠগড়ায় আশার অনুসারীরা আওয়ামী লীগের আসামি ও সাবেক জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত চান এমপি আব্দুল্লাহ আল আমিন চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারসহ শ্রমিকদল নেতাসহ গ্রেপ্তার ৩
ইতিহাস

বক্তাবলী গণহত্যা দিবস আজ: ১৩৯ প্রাণ আর ২২ গ্রাম জ্বলে ওঠার এক ট্র্যাজিক ইতিহাস

Reporter
নারায়ণগঞ্জ ভয়েস ডেস্কঃ স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ
🕒 শনিবার, ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ৫:০৩ পূর্বাহ্ন • ⏱️ পড়তে সময়: ৫ মিনিট
শেয়ার করুন
বক্তাবলী গণহত্যা দিবস আজ: ১৩৯ প্রাণ আর ২২ গ্রাম জ্বলে ওঠার এক ট্র্যাজিক ইতিহাস
📷 বক্তাবলী গণহত্যা দিবস আজ: ১৩৯ প্রাণ আর ২২ গ্রাম জ্বলে ওঠার এক ট্র্যাজিক ইতিহাস। ছবি: নারায়ণগঞ্জ ভয়েস
১৯৭১ সালের ২৯ নভেম্বর। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই দিনটি একই সঙ্গে শোক ও বীরত্বের এক অনন্য স্মারক। স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র ১৭ দিন আগে, এই দিনে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার বক্তাবলী পরগনায় সংঘটিত হয় এক বর্বরোচিত গণহত্যা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞে এদিন শহীদ হন ১৩৯ জন নিরীহ গ্রামবাসী ও মুক্তিযোদ্ধা। গানপাউডার দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় বক্তাবলী পরগনার ২২টি গ্রাম।

আজ শনিবার, ঐতিহাসিক বক্তাবলী দিবস। দিবসটি উপলক্ষে স্থানীয়ভাবে শহীদদের স্মরণে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।

ভৌগোলিক গুরুত্ব ও প্রেক্ষাপট নারায়ণগঞ্জের পশ্চিমাঞ্চলে ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদীর মাঝখানে অবস্থিত বক্তাবলী পরগনা। নদীবেষ্টিত ও দুর্গম হওয়ায় একাত্তরে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সিগঞ্জসহ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য এই পথটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৌশলগত কারণে বক্তাবলী ও আলীরটেক ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই এলাকাটি মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম নিরাপদ ঘাঁটি ও ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখানে তখন কোনো রাজাকার বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। স্থানীয় ২২টি গ্রামের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় ও রসদ দিয়ে সহায়তা করতেন।

সেদিন যা ঘটেছিল স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, ২৯ নভেম্বর ভোররাতে ঘন কুয়াশার সুযোগ নিয়ে বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদী দিয়ে গানবোটযোগে বক্তাবলী ঘেরাও করে পাকিস্তানি বাহিনী। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় তারা ভোর সাড়ে ৩টার দিকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে পুরো এলাকা।

সে সময় বক্তাবলীর মুক্তারকান্দি প্রাইমারি স্কুল ও কানাইনগর হাই স্কুলে মুক্তিযোদ্ধাদের দুটি ক্যাম্প ছিল। নদীর পাড় সংলগ্ন ডিক্রির চর মসজিদ ও বিভিন্ন বাড়িতেও মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান করছিলেন। কুয়াশা থাকায় পাকিস্তানি সেনারা প্রথমে গ্রামে ঢুকতে সাহস করেনি। সকাল ৭টার দিকে কুয়াশা কাটতে শুরু করলে তারা গুলি করতে করতে গ্রামের দিকে এগোতে থাকে।

এ সময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাহফুজুর রহমানের (পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের প্রথম চেয়ারম্যান) নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। প্রায় দুই ঘণ্টা স্থায়ী এই সম্মুখযুদ্ধে ৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয় এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়। এই দুই ঘণ্টার প্রতিরোধ যুদ্ধটি ছিল অত্যন্ত হৃদয় বিদারক, কারণ এই সময়ের মধ্যে বক্তাবলীর গ্রামগুলো থেকে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ নদী পার হয়ে মুন্সিগঞ্জ ও অন্যান্য নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সক্ষম হন।

বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর সামনে একপর্যায়ে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হন। এরপরই শুরু হয় হানাদারদের নারকীয় তাণ্ডব। তারা ডিক্রির চর নদীর পাড়ে ৪০ জন গ্রামবাসীকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। লক্ষ্মীনগর কবরস্থানের কাছে খড়ের গাদায় লুকিয়ে থাকা গ্রামবাসীদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়। রাজাপুরের সরিষা ক্ষেতগুলোতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে অসংখ্য লাশ।

সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র শহীদুল্লাহ ও মুনীরুজ্জামানসহ ১৩৯ জন মানুষকে হত্যা করা হয়। দিনভর লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ শেষে বিকেলের দিকে গানপাউডার ছিটিয়ে বক্তাবলীর ২২টি গ্রাম সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করে দেয় হানাদার বাহিনী।

যাচাইকৃত তথ্য ও বর্তমান পরিস্থিতি মুক্তিযুদ্ধকালীন নথিপত্র ও স্থানীয় ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, নারায়ণগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের সময় ১০৯টি গণহত্যা সংঘটিত হয়। জেলায় ৩৩টি বধ্যভূমি ও গণকবর এবং ৪৬টি নির্যাতনকেন্দ্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে বক্তাবলী গণহত্যা অন্যতম ভয়াবহ।

তবে স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এই গণহত্যার শিকার শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা আজও সরকারিভাবে গেজেটভুক্ত হয়নি। স্থানীয়রা জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ছাত্রদের তালিকায় বক্তাবলীর শহীদ ছাত্রদের নাম নেই। এমনকি জেলা প্রশাসনের তালিকাতেও এই ১৩৯ জন শহীদের অনেকের নাম অনুপস্থিত।

বিশ্লেষণ ও স্থানীয়দের ক্ষোভ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, স্বাধীনতার পর যারাই রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছেন, তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণে উদাসীন ছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রাজনীতির নানা সমীকরণে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিভিন্ন সময় খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

বক্তাবলীর শহীদ পরিবারের সদস্যরা আক্ষেপ করে জানান, অর্ধশতাব্দী পার হলেও তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শহীদ পরিবারের সদস্য বলেন, "মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে যত তোড়জোড় হয়েছে, শহীদদের তালিকা নিয়ে ততটা হয়নি। অথচ এই মানুষগুলো দেশের জন্য জীবন দিয়েছিলেন কোনো প্রতিদান ছাড়াই।"

বিশেষজ্ঞদের মতে, শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক বা রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়ির চেয়ে জরুরি হলো তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা এমন গণহত্যাগুলোর সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা এবং শহীদদের নাম জাতীয় আর্কাইভে অন্তর্ভুক্ত করা।

সমাপ্তি আজ বক্তাবলী দিবসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি স্থানীয়দের দাবি—দ্রুততম সময়ের মধ্যে বক্তাবলী গণহত্যার শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা হোক এবং এই ইতিহাসকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। একাত্তরের সেই আত্মত্যাগ যেন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে না যায়, সেটাই এখন বক্তাবলীবাসীর একমাত্র চাওয়া।
Author

নারায়ণগঞ্জ ভয়েস ডেস্কঃ

নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় সংবাদ, উন্নয়ন ও জনদুর্ভোগ বিষয়ক প্রতিবেদনে কাজ করেন।

মন্তব্য করুন