সাক্ষাৎকার
সংগ্রাম থেকে হতাশা—এক বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনকথা ও আকুতি
সংগ্রাম থেকে হতাশা—এক বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনকথা ও আকুতি
নারায়ণগঞ্জ ভয়েস// মাহমুদ কাওসার
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন—নামটি শুধু একজন মানুষের নয়, বরং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত ইতিহাস। নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ধনকুন্ডা এলাকার এই বীর সন্তান কৈশোরেই জীবনকে বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আব্দুল মতিন বলেন, একদিন সকালে বাড়িতে কয়লা দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে ধানখেতে ওষুধ দিতে যান। সেদিন আর ঘরে ফেরা হয়নি। কাউকে কিছু না জানিয়ে, পরিবারকে না জানিয়ে তিনি রওনা হন ভারতের আগরতলার উদ্দেশে—মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এলাকার আরও অনেক তরুণ।
তিনি বলেন, “যাদের নিয়ে গেলাম, পথে পথে শুধু একটা কথাই ভাবতাম—ওদের কারও যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে ওদের পরিবার আমাকে ধরবে। এই ভয়, এই দায়বদ্ধতা নিয়েই আগরতলা পৌঁছাই।”
আগরতলায় কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে শুরু হয় আরেক অধ্যায়। প্রশিক্ষণ শেষ করে আব্দুল মতিনসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা সরাসরি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। অনাহার, অর্ধাহার আর মৃত্যুভয়ের মাঝেও তারা যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন শুধুমাত্র একটি স্বপ্ন নিয়ে—একটি স্বাধীন, শোষণমুক্ত বাংলাদেশ।
“কত দিন না খেয়ে যুদ্ধ করেছি, কত কষ্ট সহ্য করেছি—সেগুলো এখনো চোখের সামনে ভাসে,” বলেন তিনি।
তবে স্বাধীনতার এত বছর পর এসে তাঁর কণ্ঠে এখন গর্বের পাশাপাশি রয়েছে গভীর হতাশা। আব্দুল মতিন বলেন,
“আজ আর ভালো লাগে না। জানি না আর কতদিন বাঁচবো। বেঁচে থাকতে সেই যুদ্ধের চেতনায় গড়া বাংলাদেশ আমরা দেখে যেতে পারবো কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন।”
তাঁর ভাষায়, দেশ সেই পথে এগোয়নি, যে পথে এগোনোর স্বপ্ন তারা দেখেছিলেন। সমাজের সর্বত্র বৈষম্য ও শোষণ এখনো বিদ্যমান। স্বাধীন দেশে ধর্ষণসহ নানা সহিংস অপরাধ তাঁকে মানসিকভাবে ব্যথিত করে।
“এগুলো আর ভালো লাগে না, এগুলো দেখতে চাই না,” বলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।
শেষ বয়সে এসে আব্দুল মতিনের দাবি খুব সাধারণ, কিন্তু গভীর অর্থবহ—ধনী-গরিবের বৈষম্য দূর করতে হবে, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সততা ও দেশপ্রেমের সঙ্গে দেশ পরিচালনা করতে হবে।
একজন মুক্তিযোদ্ধার এই জীবনকথা ও আকুতি যেন নতুন প্রজন্মের জন্য প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কি আমরা রক্ষা করতে পেরেছি?