বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন সংস্করণ

সত্য সংবাদ, নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন

--°সে লোডিং...
নারায়ণগঞ্জ
শিরোনাম
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যক্রম আরো জোরদার করার আহ্বান জামিন পেয়ে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নাসিক সাবেক মেয়র আইভীর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বাফুফের নতুন ফুটবল একাডেমি স্থাপনের উদ্যোগ: মুড়াপাড়া কলেজ মাঠ পরিদর্শন সিদ্ধিরগঞ্জে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গুলিবিদ্ধ সন্ত্রাসী সাহেব আলীর মৃত্যু নারায়ণগঞ্জে বিদেশি অস্ত্র ও হেরোইনসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী ও ১৫ মামলার আসামি সোহেল খন্দকার গ্রেফতার নারায়ণগঞ্জে জাতীয় ছাত্রশক্তির উদ্যোগে ২০২৬ সালের জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসক ও জনবলসংকট: ৫০০ শয্যায় উন্নীতকরণের কাজ চলমান বিদেশি অস্ত্র, গুলি ও হেরোইনসহ ফতুল্লার আলোচিত সোহেল গ্রেপ্তার ফিটনেসবিহীন ও অবৈধ যানবাহন বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ ডিসির তোলারাম কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী ২৮ নভেম্বর, নিবন্ধনের শেষ তারিখ ১০ নভেম্বর ।
বিশ্লেষণ

১৯৭১ থেকে ২০২৫: সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবনা

Reporter
নারায়ণগঞ্জ ভয়েস: মাহমুদ কাওসার স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ
🕒 মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ৬:৫৮ পূর্বাহ্ন • ⏱️ পড়তে সময়: ৭ মিনিট
শেয়ার করুন
১৯৭১ থেকে ২০২৫: সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবনা
📷 ১৯৭১ থেকে ২০২৫: সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবনা। ছবি: নারায়ণগঞ্জ ভয়েস
১৯৭১ থেকে ২০২৫: সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাবনা

নারায়ণগঞ্জ ভয়েস// মাহমুদ কাওসার:

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। আর ২০২৫ সালে দাঁড়িয়ে সেই সংগ্রামের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধারা যখন অতীত ও বর্তমানকে মিলিয়ে দেখেন, তখন উঠে আসে গর্ব, ত্যাগ, আশা ও কিছু না-পাওয়ার বেদনার কথাও। নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ উপজেলার গোদনাইল এলাকার কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে সেইসব অভিজ্ঞতা ও ভাবনার চিত্র। নিচে তুলে ধরছি কয়েকজন বীর মুক্তিযোদ্ধার কথা -


১) সংগ্রাম থেকে হতাশা—এক বীর মুক্তিযোদ্ধার জীবনকথা ও আকুতি


বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মতিন—নামটি শুধু একজন মানুষের নয়, বরং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের এক জীবন্ত ইতিহাস। নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ধনকুন্ডা এলাকার এই বীর সন্তান কৈশোরেই জীবনকে বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আব্দুল মতিন বলেন, একদিন সকালে বাড়িতে কয়লা দিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে ধানখেতে ওষুধ দিতে যান। সেদিন আর ঘরে ফেরা হয়নি। কাউকে কিছু না জানিয়ে, পরিবারকে না জানিয়ে তিনি রওনা হন ভারতের আগরতলার উদ্দেশে—মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন এলাকার আরও অনেক তরুণ।

তিনি বলেন, “যাদের নিয়ে গেলাম, পথে পথে শুধু একটা কথাই ভাবতাম—ওদের কারও যদি কিছু হয়ে যায়, তাহলে ওদের পরিবার আমাকে ধরবে। এই ভয়, এই দায়বদ্ধতা নিয়েই আগরতলা পৌঁছাই।”

আগরতলায় কঠোর প্রশিক্ষণ শেষে শুরু হয় আরেক অধ্যায়। প্রশিক্ষণ শেষ করে আব্দুল মতিনসহ অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধারা সরাসরি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। অনাহার, অর্ধাহার আর মৃত্যুভয়ের মাঝেও তারা যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন শুধুমাত্র একটি স্বপ্ন নিয়ে—একটি স্বাধীন, শোষণমুক্ত বাংলাদেশ।

“কত দিন না খেয়ে যুদ্ধ করেছি, কত কষ্ট সহ্য করেছি—সেগুলো এখনো চোখের সামনে ভাসে,” বলেন তিনি।

তবে স্বাধীনতার এত বছর পর এসে তাঁর কণ্ঠে এখন গর্বের পাশাপাশি রয়েছে গভীর হতাশা। আব্দুল মতিন বলেন,
“আজ আর ভালো লাগে না। জানি না আর কতদিন বাঁচবো। বেঁচে থাকতে সেই যুদ্ধের চেতনায় গড়া বাংলাদেশ আমরা দেখে যেতে পারবো কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন।”

তাঁর ভাষায়, দেশ সেই পথে এগোয়নি, যে পথে এগোনোর স্বপ্ন তারা দেখেছিলেন। সমাজের সর্বত্র বৈষম্য ও শোষণ এখনো বিদ্যমান। স্বাধীন দেশে ধর্ষণসহ নানা সহিংস অপরাধ তাঁকে মানসিকভাবে ব্যথিত করে।
“এগুলো আর ভালো লাগে না, এগুলো দেখতে চাই না,” বলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

শেষ বয়সে এসে আব্দুল মতিনের দাবি খুব সাধারণ, কিন্তু গভীর অর্থবহ—ধনী-গরিবের বৈষম্য দূর করতে হবে, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সততা ও দেশপ্রেমের সঙ্গে দেশ পরিচালনা করতে হবে।

একজন মুক্তিযোদ্ধার এই জীবনকথা ও আকুতি যেন নতুন প্রজন্মের জন্য প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়—স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ কি আমরা রক্ষা করতে পেরেছি?

২) বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন মোল্লার স্মৃতিচারণ

বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন মোল্লার স্মৃতিচারণ


মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন মোল্লা। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন গোদনাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র। দেশের স্বাধীনতার ডাক যখন চারদিকে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, তখন ছাত্রজীবন ও ভবিষ্যতের সব স্বপ্ন এক পাশে রেখে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে।

মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন মোল্লা জানান, তিনি ভারতে গিয়ে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধের ময়দানে অংশ নেন। যুদ্ধের সময়কার স্মৃতি বলতে গিয়ে তিনি বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সহযোদ্ধাদের ত্যাগ, না খেয়ে দিনের পর দিন যুদ্ধ করার কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তাঁর চোখে পানি চলে আসে।

তিনি বলেন, “কত কষ্ট করে, খেয়ে না খেয়ে আমরা যুদ্ধ করেছি দেশ স্বাধীন করার জন্য। কিন্তু সেই স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত দেশের যে অবস্থা, তা আমরা মুক্তিযোদ্ধারা কখনোই কামনা করিনি।”

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর হতাশার কথাও তুলে ধরেন এই বীর সেনানি। তাঁর মতে, স্বার্থান্বেষী একটি মহল দীর্ঘদিন ধরে দেশের সর্বনাশ করছে। তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য লুটপাট চালিয়ে দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এর ফলে সমাজে বৈষম্য আরও বেড়েছে এবং সাধারণ মানুষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

মহিউদ্দিন মোল্লা বলেন, “আমাদের স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র। জানি না আর কতদিন বাঁচবো, কিংবা সেই বৈষম্যহীন রাষ্ট্র দেখে যেতে পারবো কিনা।” তাঁর কণ্ঠে ছিল দীর্ঘ অপেক্ষা আর অজানা আশঙ্কার সুর।

তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল ভ্রাতৃত্ববোধ, ন্যায়ভিত্তিক বিচার ব্যবস্থা ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। আজও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি বলে তিনি মনে করেন। নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে এগিয়ে আসতে হবে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন মোল্লার এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত বেদনার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এটি স্বাধীনতার ৫ দশক পরও মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন অপূর্ণ থাকার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

৩) বীর মুক্তিযোদ্ধা এহসান কবির রমজানের স্মৃতিচারণ

বীর মুক্তিযোদ্ধা এহসান কবির রমজানের স্মৃতিচারণ


মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি আজও বুকে ধারণ করে চলেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা এহসান কবির রমজান। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন গোদনাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র। তখন তাঁর বাড়ি ছিল বর্তমান ২নং ঢাকেশ্বরী স্ট্যান্ড এলাকায়। দেশমাতৃকার মুক্তির টানে কৈশোর বয়সেই তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন মহান মুক্তিযুদ্ধে।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য পরিবারের কাউকে কিছু না জানিয়েই নিজের বাড়ি থেকে ২০ মণ চাল বিক্রি করেন এহসান কবির রমজান। সেই অর্থ নিয়েই ভারতের প্রশিক্ষণ শিবিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন তিনি। সহযোদ্ধা মতিন ভাই, রোশন আলী, জয়নাল আবেদীন, আলী হোসেন (কমান্ডার) ও খোরশেদ আলমের সঙ্গে নদী পার হয়ে পায়ে হেঁটে কাইকারটেক হয়ে ভারবির রামকৃষ্ণপুরে পৌঁছান। সেখান থেকেই লঞ্চযোগে ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তারা।

যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে তিনি খবর পান—পাকিস্তানি বাহিনী পালিয়ে যাচ্ছে, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। প্রথমে এ খবর বিশ্বাসই করতে পারেননি তিনি। এত দ্রুত দেশ স্বাধীন হবে, তা কল্পনাতীত ছিল। তবে নিশ্চিত হওয়ার পর এক দৌড়ে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি। স্বাধীন দেশের আলো প্রথম দেখার সেই মুহূর্ত আজও তাঁর স্মৃতিতে অমলিন।

স্বাধীনতার এত বছর পর দাঁড়িয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা এহসান কবির রমজান বাস্তবতা নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি মনে করেন—দেশ যতটুকু এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, ততটা এগোতে পারেনি। বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন, বৈষম্য দূরীকরণ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি।

তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল একটি শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়া। সেই স্বপ্ন পূরণে রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে। নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা।

মুক্তিযোদ্ধা এহসান কবির রমজানের এই স্মৃতিচারণ শুধু তাঁর ব্যক্তিগত গল্প নয়, এটি ১৯৭১ সালের অগণিত তরুণের ত্যাগ, সাহস ও স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি—যাদের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন বাংলাদেশ।
পরিশেষে বলতে পারি জাতী চায় পরিবর্তন এবং বৈষম্যহীন রাষ্ট্র।

Author

নারায়ণগঞ্জ ভয়েস: মাহমুদ কাওসার

নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় সংবাদ, উন্নয়ন ও জনদুর্ভোগ বিষয়ক প্রতিবেদনে কাজ করেন।

মন্তব্য করুন